[ অনলাইন ] 2026-06-11
 
সুদ পরিশোধে টাকা লাগবে বেশি, কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে কম
 
আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে সুদ বাবদ বরাদ্দ তেমন বাড়ছে না। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়ে রেখেছে, তার বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই সুদ দিতে হবে।

চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। সংশোধিত বাজেটকে ভিত্তি ধরলে নতুন বাজেটে সুদ ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ছে ৫০০ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। বাজেট–ঘাটতি হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বাজেট–ঘাটতির জন্য বড় আকারের ঋণ নিতে হবে সরকারকে। বিপরীতে বড় অঙ্কের সুদও দিতে হবে। অথচ সুদ ব্যয়ের বরাদ্দ কমিয়ে ধরা হয়েছে।

অর্থ বিভাগ হিসাব করেছিল, আগামী অর্থবছরে সুদ ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সুদ ব্যয় কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা বাড়াতে হবে সরকারকে।

অর্থ বিভাগের বাজেট সংক্ষিপ্ত-সারের তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সুদ ব্যয় ছিল ৭৭ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। ছয় বছরের মাথায় সুদ ব্যয়ের বরাদ্দ বাড়ছে ৪৯ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বৃদ্ধিও কম নয়। রাজস্বঘাটতি, উচ্চ সুদহার ও ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে এ ব্যয় বাড়ছে।

সুদ ব্যয়কে বলা হয় বাধ্যতামূলক ব্যয়, অর্থাৎ একবার ঋণ নেওয়া হলে চুক্তি অনুযায়ী সুদ পরিশোধ করতেই হয়। সরকারের পরিচালন ব্যয় বা অনুন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে এটি এখন অন্যতম খাত। এই ব্যয় এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা বাজেটের অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতকে চাপে ফেলছে।

ঋণ কত

অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট ঋণের স্থিতি ছিল ২৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি ১৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১০ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ এত বেশি বলেই সুদের জন্য বরাদ্দও রাখতে হচ্ছে বেশি। এবার পরিচালন ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় হবে ঋণের সুদ দিতে।

ঋণের অর্থ এমন কিছুতে বিনিয়োগ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়। ঋণের ক্ষেত্রে এটাই সারা পৃথিবীতে অনুসৃত উত্তম রীতি। ঋণ নিয়ে প্রকল্প করা হলে যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় ও রপ্তানি বা কর আদায় বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই আয় দিয়ে সুদ পরিশোধ করা সহজ হয়। এ ধরনের ঋণকে তাই অর্থনীতিবিদেরা উৎপাদনশীল ঋণও বলে থাকেন।

কিন্তু দেশে ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ঋণের টাকায় পরিচালন ব্যয় মেটানোর উদাহরণও তৈরি করেছে বাংলাদেশ। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, রাজস্ব আয় ও পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হলে তা পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করে। ফলে ওই ঋণ পরোক্ষভাবে বেতন-ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের অর্থায়নেও ভূমিকা রাখে। ঋণ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য এ ধরনের অর্থায়ন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ নয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে সমালোচনা আছে অর্থনীতিবিদদের।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর সুদ চিত্র

সুদ ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের সুদ, ট্রেজারি বিল-বন্ডের বিপরীতে সুদ, ব্যাংকের মেয়াদি ঋণের সুদ, সরকারি কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিল বা জিপিএফের সুদ, চলতি ঋণ আর জীবনবিমা ও অন্যান্য ঋণের সুদ।

২০২২-২৩ অর্থবছরে সুদ ব্যয় হয়েছিল ৯২ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুদ ব্যয় বাবদ বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৯৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে সেবার তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা করা হয়েছিল। তাতেও কুলায়নি। ওই অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত সুদ ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে সুদ ব্যয়ের চাপ বেশি থাকায় ওই অর্থ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

কেন এত বেশি সুদ ব্যয়

রাজস্বঘাটতি পূরণে বছর বছর দেশীয় ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক–ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ দ্রুত বেড়েছে। বেড়েছে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার। বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর সরকারকে নতুন ঋণ নিতে আগের চেয়ে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে গ্রাহকদের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের সুদ ও অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদও বেড়েছে। এসব কারণে সুদ ব্যয় বাবদ বেশি বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে বাজেটে।

এ কারণে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য খাতে সরকার বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখতে পারছে না। এদিকে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি সুদ ব্যয় বাবদ বরাদ্দ থাকছে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে, বাকিটা বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয়ের জন্য।

বৈদেশিক ঋণের সুদ এখনো অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের তুলনায় অনেক কম। তবে এর পরিমাণও বাড়ছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের পর্যায়ে এসেছে বাংলাদেশ। ফলে সুদ ও ঋণের কিস্তি—দুই ধরনের দায়ই বাড়ছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বিদেশি ঋণ পরিশোধের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুদ ব্যয় কীভাবে কমবে

রাজস্ব আয় বাড়ানো, অর্থাৎ করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট/আয়কর প্রশাসনের উন্নতি, অপচয় ও অগ্রাধিকারহীন ব্যয় কমানো ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সরকারকে কম ঋণ নিতে হবে। ফলে সুদের জন্য এত বরাদ্দ রাখতে হবে না ভবিষ্যতে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতিকেও বেশি সুদ ব্যয়ের কারণ বলে মনে করা হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। মূল্যস্ফীতি কমে এলে ধীরে ধীরে সুদ ব্যয়ও কমে আসবে।

এ ছাড়া উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি ঋণের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ও অপেক্ষাকৃত কম সুদের ঋণ নিতে পারে সরকার। পুরোনো ব্যয়বহুল ঋণ পুনঃ অর্থায়নও করা যায়। এতে সুদ পরিশোধের চাপ কমবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদ ব্যয় নিজে কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু এমন গতিতে ঋণ ও ঋণের সুদ বাড়ছে যে সে তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে সরকারের নতুন ঋণের একটি বড় অংশ পুরোনো ঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় সামলাতে চলে যাচ্ছে। এতে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের জন্য আর্থিক পরিসর ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ ভর্তুকিতেই ব্যয় হয়ে যায় পরিচালন বাজেটের ৮০ শতাংশের বেশি। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ করতে না পারার কারণে ঋণ ঝুঁকি বাড়ছে। দরকার যথাযথ ঋণ ব্যবস্থাপনা। তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, বৈদেশিক ঋণ বেশি নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে সুদ ব্যয় কমবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা ছাড়া সুদ ব্যয়ের এত বিপুল বরাদ্দ থেকে সরকারের আপাতত মুক্তি নেই এবং জাদুকরি সমাধানও নেই। বড় সমাধান হতে পারে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। কিন্তু সংস্কার ছাড়া এই সম্ভাবনা কম।
Print Close  
Print Close  
News Source
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits /Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2009-2010, Allright Reserved