[ অনলাইন ] 2026-06-11
 
বাজেট: সীমিত রাজস্বের বিপরীতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
 
প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আগে-পরে আমরা যারা অর্থনীতি নিয়ে আগ্রহী, তারা বেশ ব্যস্ত সময়ই পার করে থাকি। টিভি চ্যানেল আর পত্রিকাগুলোও বাজেট নিয়ে আলোচনায় বেশ সরগরম থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটের কি আদৌ তাৎপর্য আছে? সাদা চোখে মনে হতে পারে, আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরের মতো বিষয়। তবে একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, প্রত্যেক মানুষের জীবনমানের সঙ্গে জাতীয় বাজেটের সম্পর্ক রয়েছে।

বাজেট আলোচনায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ আর মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—জিনিসপত্রের দাম কি বেড়ে যাবে? এ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে, বাজেটের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কয়েকভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।

প্রথমত, বাজেটের আকার যদি তুলনামূলকভাবে বড় হয়, যেটিকে আমরা সম্প্রসারণমূলক বাজেট বলি, সে ক্ষেত্রে ব্যয় বেশি হলে তা ভোগ ও চাহিদার পরিমাণ (জোগানের তুলনায়) বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এটি মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে।

তবে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষত বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটাই জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় সরকারি ব্যয় না বাড়লে যে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এর পাশাপাশি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের সংসারে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা অনেক ক্ষেত্রেই মেটানো কঠিন, সেখানে চাহিদাকেন্দ্রিক মূল্যস্ফীতির বিষয়টি তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

    বাজেটের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন প্রত্যক্ষ করের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কর আহরণ বাড়ানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো সামাজিক খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আহরণের হার কম হলে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারকে ঋণ নিতে হতে পারে, ফলে অর্থের প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। ঘাটতি বাজেটে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিষয়টিতে তাই কিছুটা রক্ষণশীল হওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, পণ্যের (বা পণ্যের কাঁচামালের) ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কিংবা আমদানি শুল্ক আরোপ করা (বা বৃদ্ধি করা) হলে সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাজেটে জিনিসপত্রের দামের ওপর এ ধরনের সরাসরি প্রভাবের বিষয়টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়।

রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে তাই পরোক্ষ করের (যেমন ভ্যাট) ওপর নির্ভরতা কমানো এবং প্রগতিশীল (প্রগ্রেসিভ) ও প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, পরোক্ষ করের বোঝা যেহেতু সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে বর্তায়, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমলে সেটি ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য কমাতেও সহায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, জ্বালানি ইত্যাদির ওপর করারোপ, ভর্তুকি কমানো ইত্যাদি বিষয়গুলোও মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কলকারখানার উৎপাদন খরচ, পণ্য পরিবহন খরচ ইত্যাদি বাড়াতে পারে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে বাজেটকেন্দ্রিক মূল্যস্ফীতি সরকারি রাজস্ব ব্যয়ের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতার সঙ্গে অধিক সংশ্লিষ্ট। বাজেট প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো তাই জরুরি। বাজেটকে কেন্দ্র করে নতুন করে মূল্যস্ফীতি যাতে না হয়, তাই সরকারকে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, কাঁচামাল ও জ্বালানির যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ; নিত্যপ্রয়োজনীয়, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। এর পাশাপাশি সঠিক মুদ্রানীতির প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের আগ্রহের (কিংবা অনাগ্রহের) ব্যাপার, তা হলো ব্যক্তি আয়করের নিম্নসীমা। করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত থাকলে (বা কমানো হলে) নিম্নমধ্যবিত্তদের অনেকেই নতুন করে আয়করের আওতায় পড়তে পারেন, আবার পুরোনো করদাতাদের করের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে বাড়তি চাপে ফেলতে পারে। রাজস্ব আহরণের জন্য সহজ উপায় হলেও মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এ আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো হলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। এ ক্ষেত্রে ট্যাক্স-স্ল্যাবের ওপরের ধাপগুলোতে পরিমার্জন করে, অতিধনীদের থেকে এ রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করা যেতে পারে।

বাজেট ঘিরে তৃণমূলের মানুষের আরেকটি আগ্রহের জায়গা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। পূর্ববর্তী বছরের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ঘিরে মানুষের মনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সন্দেহ নেই যে এর প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বর্তমান রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আসন্ন বাজেটে এই কার্ডের আওতা ও অর্থায়নের বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।

নবনির্বাচিত সরকারের প্রস্তাবিত প্রথম বাজেট ঘিরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রত্যাশা থাকলেও সীমিত রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় এই প্রত্যাশা পূরণ খুব সহজ কাজ নয়। তবে বাজেটের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন প্রত্যক্ষ করের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কর আহরণ বাড়ানো এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো সামাজিক খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো। তবে এ লক্ষ্য পূরণের জন্য রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার অভাব ও বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলোর আশু সমাধান জরুরি।

    সায়মা হক বিদিশা অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Print Close  
Print Close  
News Source
            Top
            Top
 
Home / About Us / Benifits /Invite a Friend / Policy
Copyright © Hawker 2009-2010, Allright Reserved