[ অনলাইন ] 03/04/2025 |
 |
|
|
দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করেছে। সাত মাসের ব্যবধানে এ হার কমেছে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
|
|
|
দেশের
সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করেছে। সাত মাসের ব্যবধানে এ হার
কমেছে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগামী দিনে আরও কমার আশা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের মতে, মূলত পাঁচটি কারণে সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু
করেছে। এর মধ্যে রয়েছে : এক. শীতের সবজিসহ অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ও
সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় মূল্য হ্রাস পাওয়া। দুই. অতিরিক্ত সংকোচনমুখী
মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানো। তিন. ডলারের
বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা। চার. কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে
টাকা ছাড়িয়ে সরকারকে ঋণের জোগান বন্ধ করা এবং ছাপানো টাকা বাজার থেকে
পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া এবং পাঁচ. আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমা। এসব
কারণে মূল্যস্ফীতির হার কমছে এবং আরও কমবে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস
অনুযায়ী, আগামী দিনে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও কমবে। যে কারণে বৈশ্বিক
মূল্যস্ফীতির হার আরও কমে যাবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে
বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের সার্বিক হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত নিয়ে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি এক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত
মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। গত জুলাইয়ে এ হার সর্বোচ্চ
১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া নানা
পদক্ষেপের কারণে এ হার গত ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। আগামী
দিনে এ হার আরও কমবে বলে আভাস দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতির হার কমার কারণ
হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূলত পাঁচটি কারণে এ হার কমছে। শীতের মৌসুমে
দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ভালো হয়েছে। ফলে
বাজারে সবজির সরবরাহ বেড়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমেছে। বর্তমান সরকার
ক্ষমতা নেওয়ার পর গৃহীত ব্যবস্থার ফলে দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ হয়েছে।
প্রবাসীদের হুন্ডিতে টাকা পাঠানোর প্রবণতা কমেছে। যে কারণে গত মার্চে ২৬
দিনেই প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। রপ্তানি আয়ও বেড়েছে প্রায়
১০ শতাংশ।
এসব কারণে বাজারে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে। এতে ডলার সংকট
কেটে গেছে। টাকার মান স্থিতিশীল রয়েছে। আগে ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১৩২ টাকায়
উঠেছিল। এখন বিক্রি হচ্ছে ১২২ টাকা। প্রতি ডলারে দাম কমেছে ১০ টাকা। ফলে
মূল্যস্ফীতির হারে চাপ কমেছে।
২০২২ সাল থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক
মূল্যস্ফীতির হার কমাতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। বর্তমান গভর্নর
দায়িত্ব নেওয়ার পর মুদ্রানীতিকে আরও কঠোর করেছেন। এতে টাকার প্রবাহ কমেছে।
ফলে বাজারে চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতির হার কমতে সহায়তা করেছে। আগে টাকার
প্রবাহ বেড়েছিল ৮ শতাংশের বেশি। এখন বেড়েছে ১ শতাংশের সামান্য বেশি। ফলে
টাকার প্রবাহজনিত কারণে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়েনি।
ক্ষমতাচ্যুত
আওয়ামী লীগ সরকার গত বছরের জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা
ছাপিয়ে ঋণ নিয়েছে। ছাপানো টাকায় মোট ঋণ দিয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া লুটপাটের কারণে দুর্বল ব্যাংকগুলোকেও টাকা ছাপিয়ে ঋণের জোগান দেওয়া
হয়েছে। এসব কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি।
এদিকে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকাকে বলা হয় হাইপাওয়ার্ড বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন
মুদ্রা। এ মুদ্রা বাজারে এলে কয়েক গুণ টাকার সৃষ্টি হয়। ফলে মুদ্রার সরবরাহ
বেড়ে যায়। এসব টাকা উৎপাদন খাতে না হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে
বেপরোয়া গতিতে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া বন্ধ
করেছে। তবে ৬টি ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা
দিয়েছে দুই দফায়। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সমপরিমাণের চেয়ে বেশি
টাকা তুলে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে দিয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতিতে চাপ
বাড়েনি। এছাড়া বিগত সরকারের নেওয়া ঋণের মধ্যে বর্তমান সরকার ১৫ হাজার ৭১২
কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। অর্থাৎ ছাপানো টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। এতে
মূল্যস্ফীতিতে চাপ কমেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমতে
শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী বছর পণ্যের দাম আরও কমবে। এতে
আমদানি খরচ কমে আসবে। এর প্রভাবে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারও কমেছে। দুই
বছর ধরে দেশে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারই বেশি হচ্ছিল। আমদানি পণ্যের দাম
কমায় এবং ডলারের জোগান বাড়ায় একদিকে আমদানি বেড়েছে; অন্যদিকে পণ্যের দাম
কমেছে। এতে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারও কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দিনে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলে বৈশ্বিকভাবে
মূল্যস্ফীতির হার আরও কমে যাবে। যদিও ইতোমধ্যে এ হার বেশ কমেছে। উন্নত
অর্থনীতিতে এ হার কমে ২ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে। আগে ছিল ৮ থেকে ১০
শতাংশ। বৈশ্বিকভাবে এ হার কমায় বাংলাদেশেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, সরকার এখনো সব ধরনের পণ্যের দাম সঠিক মাত্রায়
নামিয়ে আনতে পারেনি। যে কারণে জুলাইয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে উৎপাদন কম
হতে পারে। তখন পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির হারও বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
|
|