[ অনলাইন (উপ-সম্পাদকীয়) ] 03/04/2025
 
ব্যাংক লুটের রাজনীতি
ড. মাহফুজ পারভেজ:

বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে ২৮ উপায়ে দুর্নীতি ও লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসাবে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হওয়ার তথ্য প্রকাশের বিষয়টি সবার জানা। এটিও জানা, সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয় ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল খাত, তারপর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত, তারপর ভৌত অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত ও কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ দেশ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে বিদেশে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার আদৌ দেশে ফেরত আনা যাবে কিনা, সে বিষয়ে রয়েছে দোলাচল।

ব্যাংক লুটের রাজনীতি কতটুকু সর্বগ্রাসী হয়েছিল, তার একটি প্রমাণ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম। তার মতে, পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত, যার কারণে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। দেশে ৬১টি ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও হাসিনার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে তার আত্মীয়স্বজন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও অলিগার্ক ব্যবসায়ী এবং ‘রবার ব্যারনে’ পরিণত হওয়া লুটেরাদের পুঁজি লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এতগুলো ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বারবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও এমন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে হাসিনাকে নিবৃত্ত করা যায়নি।

ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ আমলে বেক্সিমকো, এস আলম গ্রুপ ব্যাংক লুটের নেতৃত্ব দেয়। লুটপাটকবলিত ১১টি ব্যাংকের মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যাংক লুটেরা এস আলম কর্তৃক লুণ্ঠিত সাতটি ব্যাংক হলো-ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। উল্লেখ্য, এস আলম তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। পতিত সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লুটে নিয়েছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে। পতিত হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংকে অনাদায়ী ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনে ব্যাংক লুটের রাজনীতি ছিল ওপেন সিক্রেট, যে রাজনীতিতে ছিল দুর্বৃত্তায়ন ও শক্তি প্রয়োগ। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চাপ ও ক্ষমতার শক্তিতে বশীভূত করে দিনদুপুরে লুট করা হয়েছে মানুষের আমানত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের রীতিমতো জিম্মি করার তথ্যও পরবর্তীকালে সামনে এসেছে।

হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক আমলে ব্যাংক লুটের রাজনীতি চরম আকার ধারণ করে সম্পদ ও অর্থ লুটের অবাধ বিস্তার ঘটালেও ব্যাংক ব্যবস্থার সঙ্গে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গি জড়িত। শীর্ষতম লুটেরাগোষ্ঠী চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ হাসিনার পেয়ারের লোক হয়ে ব্যাংক লুটের নেতৃত্ব দিলেও গ্রুপের উত্থানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য রয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী ব্যাংকের ছত্রছায়ায় এস আলম গ্রুপ পুষ্ট হয়েছিল। আওয়ামী আমলে ইসলামী ব্যাংকের জামায়াতসংশ্লিষ্ট পরিচালকরা এস আলম গ্রুপকে সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু গ্রুপটি নিজেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে শুধু ইসলামী ব্যাংকই নয়, দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই গিলে খেতে উদ্যত হয়েছিল। ব্যাংক লুটের রাজনীতির হাত কত লম্বা তারও প্রমাণ আছে। স্বৈরাচারের পতনের পর এস আলম গ্রুপকে রক্ষা করতে স্থানীয় বিএনপি কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতার আগ্রহে মাঠে নেমেছিল। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের তিন রাজনৈতিক শক্তি এস আলমের পেছনে নানা সময়ে শক্তি জুগিয়েছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি ব্যাংক লুটেরাদের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মদদকারী হয়, তাহলে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার আশা সুদূরপরাহত হতে বাধ্য।

প্রসঙ্গত, ব্যাংক লুটের রাজনীতি কত নিকৃষ্ট পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, তারও প্রমাণ রেখে গেছে পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার। বিগত বছরগুলোতে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি এত ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল যে, সাধারণ মানুষের কাছেও তা অজানা ছিল না। কিন্তু তখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, কেবল সরকারের কাছেই জানা ছিল না ব্যাপারটা। তা না হলে সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট আলোচনার সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলতে পারতেন না, কারা অর্থ পাচার করে, সেই তালিকা তার কাছে নেই। নামগুলো যদি কেউ জানেন, তাহলে যাতে তালিকাটা তাকে দেওয়া হয়! কত পাওয়াফুল ছিল লুটেরাগোষ্ঠী, যাদের নাম উচ্চারণ করার সাহস পর্যন্ত ছিল না সরকারের মন্ত্রীদের!

ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি লুটেরাদের প্রটেকশন দেয়, তাহলে ব্যাংক লুটের বিচার কিংবা লুটের মাধ্যমে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ দেশে ফেরত আনা কতটুকু সম্ভব হবে? অসাধু রাজনীতিকরা যে লুটেরাদের সঙ্গে পাচারকৃত টাকার ভাগবাটোয়ারা করে সব অপরাধ মাটিচাপা দেবেন না, তার গ্যারান্টি কোথায়? বাংলাদেশে রাজনীতি আপাতত ফ্যাসিবাদমুক্ত হলেও বিদ্যমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফ্যাসিবাদী মানসিকতা ও চাঁদাবাজি-দখলবাজির মনোবৃত্তি থেকে কতটুকু মুক্ত হতে পেরেছেন? প্রতিদিনের সংবাদেই তাদের আমলনামার ফিরিস্তি দেখা যাচ্ছে।

এ হতাশার মধ্যেও চেষ্টা চলছে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার। বিদেশে বিপুল পরিমাণ পাচার হওয়া অর্থের কিছু অংশ চলতি বছরের মধ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করব। এজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করব। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে রয়েছে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু আইনি প্রক্রিয়াও জড়িত। এ বিষয়ে আপনারা আগামী মাসে আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি কিছু বলতে পারবে।’ এদিকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধসংক্রান্ত এক সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।

অর্থ লুটপাট ও পাচারের বিষয়টি উন্মোচনকারী শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি সাধ্যমতো কাজ করেছে। উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ২৮ আগস্ট দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র জানতে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’। কমিটির সদস্যরা গবেষকের একাডেমিক দৃষ্টিতে সমস্যার কারণ ও গভীরতা তুলে ধরেছেন। কত টাকা পাচার হয়েছে, তারও একটি ধারণা তারা দিয়েছেন। চট্টগ্রামে কমিটি যখন মতবিনিময় সভা করে, তখন কমিটিপ্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ও ইউসিএসআই ভার্সিটির ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. একে এনামুল হক, যিনি বর্তমানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক, তার সঙ্গে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি) আয়োজিত আলোচনায় আমি মিলিত হই। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় যা জেনেছি, তা তারা একাধিকবার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো-‘আমরা যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছি, এখানে ব্যক্তির দোষ খোঁজা নয়; আমরা একটা প্রক্রিয়া তুলে ধরেছি। আমাদের কাজ চোর ধরা না, আমরা চোরের বর্ণনা দিয়েছি।’

অনেকে মনে করতে পারেন, কমিটি আরও বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে পারত। লুণ্ঠনকারীদের ধরার ও টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আরও উদ্যোগী হতে পারত। কিন্তু কমিটির কাজের পরিধিতে তা নেই। তারা গবেষক ও একাডেমিশিয়ান হিসাবে যে সমস্যাগুলো দেখতে পেয়েছেন, সেসব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কত টাকা লুণ্ঠন হয়েছে, কারা করেছে এবং কীভাবে লুণ্ঠন করা হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাদের প্রতিবেদনে। এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাকি কাজ করার দায়িত্ব সরকার তথা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের। কারণ, কমিটির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তা আছে সরকারের। সরকার আইন করে কিংবা আদেশের বলে লুটেরাদের ধরতে পারে এবং পাচারকৃত টাকা আনার ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকার সে লক্ষ্যে কাজও করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচন, সংস্কার ও অন্যান্য ইস্যুতে উচ্চকণ্ঠে বারবার কথা বললেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের আমানত লুট করার বিষয়ে সরব নয়। ব্যাংক লুট ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। যেভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংক লুট করা সম্ভব হয়েছিল, সেভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই লুটেরাদের শাস্তি দেওয়া ও পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে এবং এভাবেই ব্যাংক লুটের রাজনীতির অবসান ঘটতে পারে। প্রয়োজনে লুটেরাদের শেয়ার ও অন্যবিধ সম্পদ জব্দ করে নিরীহ আমানতকারীদের কষ্টের টাকা ফেরত দেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সরকারকে চাপ দেয় ও সহযোগিতা করে, তাহলে লুটের টাকা উদ্ধার করা সহজ হবে।

আর যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো লুটেরাদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করে, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের আমানত ফিরিয়ে দেওয়া মোটেও সম্ভব হবে না। সরকার ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে ব্যাংক লুটের সুরাহা করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার বিষয়টি। এজন্য দেশে সদ্য অতীতে যে ব্যাংক লুটের রাজনীতির অপধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের মুক্ত হতে হবে সবার আগে।

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়